fbpx
বাংলাদেশবিশেষ সংখ্যামতামতসারাদেশ

আজ বিশ্ব হৃদরোগ দিবস, মৃত্যু বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকে

দক্ষিণবঙ্গ ডেক্সঃ আজ বিশ্ব হৃদরোগ দিবস। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনা এক মহামারী অভিশাপ। করোনায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। আবার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ১৪ দিন পর করোনামুক্ত হয়েও মৃত্যু হচ্ছে অনেকের, যাদের অনেকেরই মৃত্যুর কারণ হার্ট অ্যাটাক বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। মাত্র দুই দিন আগেই অ্যাটার্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মৃত্যুও ঠিক একইভাবে হলো। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার এক পর্যায়ে করোনা নেগেটিভ রেজাল্ট মিলেছিলো তার। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, হার্ট অ্যাটাকে তিনি আবার অসুস্থ্য হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। কোন না কোন হাসপাতালে মাঝে মধ্যেই এমন মৃত্যু ঘটছে। এ ছাড়া হাসপাতালে আনার পথে কিংবা বাড়িতে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যুর কারণ হার্ট অ্যাটাক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “বিশ্বব্যাপী করোনা শুরুর দিকে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি ভয় ছিলো নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণ।” কারণ করোনা ভাইরাস আক্রান্তের ফলে ফুসফুস অকার্যকর হয়ে মৃত্যু হয়। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রমাণ মেলে, শুধু নিউমোনিয়ায়ই নয়, করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে শরীরের যেকোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটানো বা বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নানা ধরণের অ্যান্টিভাইরাল ঔষুধের মাধ্যমে করোনায় আক্রান্তদের ফুসফুসের সংক্রমণ আগের তুলনায় অনেক বেশি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে আক্রান্তদের মধ্যে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঘটনা যেমন অনেক বেশি, তেমনি আগে থেকে হৃদরোগে আক্রান্তরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব হৃদরোগ দিবস।

জাতীয় হৃদরোগ গবেষণা ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির তথ্য উদ্ধৃত্ত করে বলেন, “সর্বশেষ গবেষণার ফলাফল অনুসারে দেখা গেছে, আগে থেকে হৃদরোগ বা মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ জনিত রোগ ছিলো না, এমন করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ করোনার প্রভাবে হৃদরোগ বা মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া তাদের মধ্যে ১৬ শতাংশের হার্টবিট অস্বাভাবিক কমবেশি দেখা গেছে, ৭ শতাংশের কার্ডিয়াক ইনজুরি, ৮.৭ শতাংশের কার্ডিয়াক শক দেখা দিয়েছে। আর করোনায় আক্রান্ত যাদের আগে থেকে হৃদরোগ জনিত সমস্যা ছিলো, তাদের সবার ক্ষেত্রে এসব প্রবণতা আরো ১০ শতাংশ হারে বেশি দেখা গেছে।”

ওই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় একই ধারা দেখা যাচ্ছে। এমনকি হাসপাতালগুলোতে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগের আগের যেসব কমরবিডিটি ছিলো তার অন্যতম ছিলো হৃদরোগ। এছাড়া শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে মৃত্যুর ঘটনাও অনেক বেশি। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফাউন্ডেশনের জার্নাল ‘গ্লোবাল হার্ট’ এর তথ্য অনুসারে করোনাভাইরাসের প্রভাবে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু ৫১ শতাংশ থেকে ৬৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া এখন যত মানুষ করোনায় জটিল অবস্থায় পৌঁছে হাসপাতালে যাচ্ছে, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক।”

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহম্মেদ বলেন, “আমাদের হাসপাতালে এখনো যারা আসছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকলেও এর পরেই রেয়েছে হৃদরোগের সমস্যা। যারা মারা যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রেও করোনা করোনাজনিত হর্ট অ্যাটাকের মাত্রা বেড়েছে। আরেকটি আর্ন্তজাতিক জার্নালের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, “ইতালিতে যারা হাসপাতালের বাইরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, তাদের অটোপসি করা হচ্ছে না। ফলে ঠিক কোন কারণে কত শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে, তার কোন সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই।”

‘ব্রেভ’ (বাংলাদেশ রিস্ক অব অ্যাকিউট ভাসকুলার ইভেন্টস) নামের একটি সংগঠনের পরিচালনায় হার্ট অ্যাটাকের ওপর করা এক গবেষণার ফলাফল অনুসারে, পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের তুলনায় বাংলাদেশিরা সাধারণত ১০ বছর আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে আর্সেনিক, কপার ও সিসার মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু বাংলাদেশিদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। লন্ডনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেসের (এনআইসিভিডি) গবেষকরা এই গবেষণায় অংশ নেন। গবেষণায় ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চমাত্রার খারাপ কোলেষ্টেরল ও ধূমপানকে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া রোগা ও স্থুল মানুষের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি বলেও জানানো হয়।

আইসিডিডিআরবি সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে হৃদরোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চার বছর আগে শেষ হওয়া ওই গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশে যারা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়, তাদের গড় বয়স ৫২ বছর। এমন ঘটনাগুলো যাদের ক্ষেত্রে ঘটে তাদের মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগেরই বয়স ৫০ বছর বছরের নিচে। এ ছাড়া প্রথমবার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে যারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হৃদরোগ হাসপাতাল এনআইডিভিডিতে ভর্তি হয়েছে, তাদের মধ্যে ১২ শতাংশ নারী। হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে ভাত ও চিনির সম্পর্কের প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে। অন্যদিকে মাছের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, যদি মাছে প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন বা আর্সেনিকের মতো বিষাক্ত ধাতু বেশি থাকে।

সূত্রঃ কালেরকণ্ঠ

Related Articles

Back to top button