চাঁদাবাজি ও অনিয়মে জর্জরিত কেসিসি পাইকারি কাঁচাবাজার, রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক | খুলনা
প্রকাশ: ১৪ ঘন্টা আগে
ছবি: সংগৃহীত

দখলদারি, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগে জর্জরিত খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন পাইকারি কাঁচাবাজার। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে শ্রমিক থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী—সবাই শোষণের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে বাজারদরেও। একই সঙ্গে রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন।

অভিযোগ অনুযায়ী, খুলনা নগরের ২৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম মঈনুল ইসলাম নাসির ও তার ঘনিষ্ঠ নজরুল ইসলাম বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর নাসির পলাতক থাকলেও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে বাজার পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

কেসিসির নামে টাকা আদায়, পায় না করপোরেশন

বাজারে প্রবেশ করা যানবাহনের কাছ থেকে কেসিসির নামে ১০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। তবে আদায়কৃত অর্থ কেসিসি পাচ্ছে না বলে অভিযোগ। প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা তুলে তা ভাগবাটোয়ারা করা হচ্ছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে কেসিসির জায়গা দখল করে এ কার্যক্রম চলছে।

এছাড়া ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন প্রবেশপথে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়েও সমিতির নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। আড়ৎঘর ভাড়া বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

‘উন্নয়ন ফান্ড’ নামে কোটি টাকার আদায়

প্রায় ১৫ বছর ধরে বাজারের ‘উন্নয়ন ফান্ড’ নামে প্রতিদিন প্রত্যেক আড়ত মালিকের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব টাকার কোনো জবাবদিহিতা নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কেসিসি সূত্রে জানা যায়, বৈধভাবে বরাদ্দকৃত দোকানঘর রয়েছে ১৩৬টি এবং অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে আরও ৪৪টি আড়ৎঘর। ২০০৬ সালের পর নিরালা থেকে বাজারটি ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে এটি চাঁদাবাজির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই কার্যক্রম

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কেসিসি পাইকারি বাজার আড়ত মালিক সমিতির কোনো নিবন্ধন নেই। তবুও পূর্বে সিটি করপোরেশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে বিতর্ক ও চাঁদাবাজির কারণে বাজার পরিচালনায় একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, বাজার ঘিরে অভিযোগের শেষ নেই। অনিয়ম বন্ধে উদ্যোগ নিলে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। নতুন মেয়র দায়িত্ব নিলে বিষয়টি সমাধান সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

আড়তঘর মালিক হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, তার পিতার নামে বরাদ্দ পাওয়া ৮২নং আড়তঘর অন্য এক ব্যক্তি দখল করে ব্যবসা করছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও সমাধান হয়নি।

বাগেরহাট থেকে আসা ব্যবসায়ী ইমদাদ সরদার বলেন, বাজারে প্রবেশের পর বিভিন্ন খাতে টাকা দিতে হয়। ফলে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।

সমিতির বক্তব্য

রেজিস্ট্রেশনবিহীন সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, কেসিসি থেকে গঠনতন্ত্র দেওয়া হয়েছে এবং পূর্বে সিটি করপোরেশন থেকে নির্বাচন হয়েছে। তিনি দাবি করেন, চাঁদাবাজি হয় না; সবার সম্মতিতে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়, যা থেকে স্টাফদের বেতন দেওয়া হয়।

আইনগত অবস্থান

খুলনা বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক এস এম ফারুক আহমেদ বলেন, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ জানান, পাইকারি বাজারের বিষয়ে অবগত আছেন এবং বাজার আইনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রেজিস্ট্রেশন না থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • কেসিসি
  • খুলনা সিটি করপোরেশন
  • চাঁদাবাজি
  • পাইকারি কাঁচাবাজার
  • বাজার সিন্ডিকেট
  • রেজিস্ট্রেশনবিহীন সমিতি