ছবি: সংগৃহীত
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল উরুগুয়ে। এবারও সেই হতাশার পুনরাবৃত্তি ঘটল। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ সৌদি আরব ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করার পর শনিবার (২৭ জুন) শেষ গ্রুপ ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে মাত্র ২ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
‘এইচ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে উরুগুয়ের প্রধান কোচ মার্সেলো বিয়েলসা দলের ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। ৭০ বছর বয়সী এই কোচ বলেন, ‘এই হতাশার জন্য আমি দায়ী। এই পারফরম্যান্সের আলাদা কোনো ব্যাখ্যা নেই। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় জাতীয় দলের সঙ্গে আমার সময়কে কীভাবে মনে রাখা হবে, তাহলে বলব—এটি এমন একটি অধ্যায়, যা কোনো স্থায়ী ছাপ রাখতে পারেনি।’
তিন বছরের দায়িত্বকালেও উরুগুয়ের ফুটবলে উল্লেখযোগ্য কিছু দিতে না পারার হতাশা প্রকাশ করে বিয়েলসা বলেন, ‘আমি উরুগুয়ের ফুটবলে কিছুই দিতে পারিনি। কোনো দেশে তিন বছর কাজ করার পর যদি ফলাফল না আসে, তাহলে সেই কাজ কখনোই শিকড় গাঁড়তে পারে না।’
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের ৪২ মিনিটে ভুল করে গোল হজম করা গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরাকে বিরতির পর মাঠে না নামানোর বিষয়ে বিয়েলসা জানান, মুসলেরা নিজেই হাফটাইমে মাঠ ছাড়তে চেয়েছিলেন। কোচ বলেন, ‘আমি বরং তার আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
৪০ বছর বয়সী মুসলেরা বিয়েলসার অনুরোধেই চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে জাতীয় দলে ফিরেছিলেন। তবে এই বিশ্বকাপে তিনটি গোলের ক্ষেত্রেই তার সরাসরি ভুল ছিল। ২০১০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের সেমিফাইনালে ওঠার অন্যতম নায়ক মুসলেরার এটি ছিল ১৩৭তম এবং সম্ভবত শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
কেন ব্যর্থ হলো উরুগুয়ে?
বিয়েলসার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একসময় তার হাই-প্রেসিং ও আক্রমণাত্মক ফুটবল বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও আধুনিক ফুটবলে এই কৌশল এখন অনেকটাই পরিচিত। ফলে প্রতিপক্ষ সহজেই তার পরিকল্পনা মোকাবিলা করতে পারছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কাতার বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে অবশ্য দারুণ ছন্দে ছিল উরুগুয়ে। দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনাকে তাদের মাঠে হারানো, ব্রাজিলকে পরাজিত করা এবং প্রথম ছয় ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল করার মতো সাফল্যও আসে। কিন্তু এরপর থেকেই পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলে দলটি।
২০২৪ কোপা আমেরিকায় শুরুটা ভালো হলেও পরে ছন্দ হারায় উরুগুয়ে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫-১ গোলে হারের পর মার্চে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করলেও দলের খেলায় আগের আগ্রাসন দেখা যায়নি।
বিশ্বকাপের আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলে নতুন কৌশল অনুশীলনের সিদ্ধান্তও সফল হয়নি। ভালভার্দেকে ডান প্রান্তে খেলানো এবং দুই স্ট্রাইকার নিয়ে নামার পরিকল্পনা সৌদি আরবের বিপক্ষে ব্যর্থ হওয়ায় বিরতির পর আবার পরিচিত ৪-৩-৩ ফরমেশনে ফিরতে বাধ্য হন বিয়েলসা।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র ম্যাচে উরুগুয়ে সুযোগ তৈরি করলেও দুটি আত্মঘাতী ভুলের কারণে জয় হাতছাড়া হয়। সেই ভুলের মূল্য দিতে হয়েছে পুরো টুর্নামেন্টেই।
দলের তারকা ফুটবলাররাও নিজেদের সেরা ছন্দে ছিলেন না। রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার ফেদেরিকো ভালভার্দে, রদ্রিগো বেনতানকুর, ম্যানুয়েল উগার্তে, ফাকুন্দো পেলিস্ত্রি ও ডারউইন নুনিয়েজ প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারেননি।
ড্রেসিংরুমের অস্থিরতাও ছিল বড় কারণ
কৌশলগত সমস্যার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোচের সম্পর্কও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২০২৪ কোপা আমেরিকার সময় দীর্ঘ এক মাসের ক্যাম্প ড্রেসিংরুমে চাপ তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সময় লুইস সুয়ারেজ প্রকাশ্যে বিয়েলসার সমালোচনা করে বলেন, কোচের মধ্যে খেলোয়াড়দের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কের অভাব ছিল এবং দলের ভেতরে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
স্পেনের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখা আগুস্তিন কানোবিওও বিয়েলসার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় হারের পর বিয়েলসা নিজেকেও ‘বিষাক্ত পারফেকশনিস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হলেও সেই জায়গায় পিছিয়ে ছিলেন বিয়েলসা। বিশ্বকাপের হাইড্রেশন বিরতি নিয়েও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেওয়াও দলের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্ম নিয়ে উরুগুয়ের নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন এবারও পূরণ হলো না। বরং দ্বিতীয়বারের মতো টানা বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।